আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর বিরল পূর্ণ সূর্যগ্রহণ, অন্ধকারে ঢেকে যাবে ইউরোপের আকাশ
প্রতিবেদক:
আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই বিরল এক মহাজাগতিক ঘটনার সাক্ষী হতে যাচ্ছে পৃথিবী। বুধবার (১২ আগস্ট) চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে এসে সূর্যের আলোকে সাময়িকভাবে আড়াল করে দেবে। এর ফলে পৃথিবীর নির্দিষ্ট একটি সরু অঞ্চল থেকে দেখা যাবে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ—যে মুহূর্তে চাঁদ সম্পূর্ণভাবে সূর্যের চাকতি ঢেকে ফেলবে এবং দিনের আলো হঠাৎ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে আসবে।
মহাকাশবিজ্ঞানীদের কাছে এবারের গ্রহণটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পূর্ণগ্রাসের ছায়াপথ আর্কটিক অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড পেরিয়ে উত্তর স্পেন এবং পর্তুগালের একটি ছোট অংশের ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, উত্তর রাশিয়া, গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, স্পেন ও উত্তর-পশ্চিম পর্তুগালের নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। ইউরোপের বিস্তীর্ণ এলাকা ও উত্তর আফ্রিকার কিছু অংশে অবশ্য গ্রহণটি আংশিক হিসেবে দৃশ্যমান হবে।
ইউরোপে বিশেষ আকর্ষণ
এবারের গ্রহণের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো—মূল ইউরোপীয় ভূখণ্ডে দীর্ঘ বিরতির পর পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। ১৯৯৯ সালের পর ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে এমন পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সুযোগ আর তৈরি হয়নি। ফলে স্পেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আগে থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানী, পর্যটক ও আকাশপ্রেমীদের ব্যাপক সমাগম হয়েছে।
বিশেষ করে উত্তর স্পেনের লিওন, বিলবাও, জারাগোজা ও ভ্যালেন্সিয়ার মতো এলাকায় গ্রহণটি সূর্যাস্তের কিছু আগে ঘটবে। ফলে আকাশে তৈরি হবে এক অনন্য ‘সানসেট ইক্লিপ্স’ বা সূর্যাস্তের সময় সূর্যগ্রহণের দৃশ্য। নাসার তথ্য অনুযায়ী, লিওনে স্থানীয় সময় রাত ৮টা ২৮ মিনিটের দিকে পূর্ণগ্রাস শুরু হয়ে প্রায় দুই মিনিট পর শেষ হবে।
আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকিয়াভিকেও পূর্ণগ্রাস দেখা যাবে। সেখানে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৪৮ মিনিটের দিকে পূর্ণগ্রাস শুরু হওয়ার কথা। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় পূর্ণগ্রাসের স্থায়িত্ব প্রায় দুই মিনিটেরও বেশি হতে পারে।
সর্বোচ্চ পূর্ণগ্রাস ২ মিনিট ১৮ সেকেন্ড
এবারের গ্রহণের সর্বোচ্চ পূর্ণগ্রাস পর্যায় থাকবে প্রায় ২ মিনিট ১৮ সেকেন্ড। তবে পৃথিবীর সব স্থান থেকে এত দীর্ঘ সময় পূর্ণগ্রাস দেখা যাবে না। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে চাঁদের ছায়ার কেন্দ্র যত কাছ দিয়ে যাবে, সেখানে পূর্ণগ্রাসের স্থায়িত্ব তত বেশি হবে।
স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলে পূর্ণগ্রাসের স্থায়িত্ব এক মিনিটের কিছু বেশি হতে পারে। আর আইসল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলের নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে এটি প্রায় দুই মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হবে। সর্বোচ্চ সময়ের পূর্ণগ্রাস হবে উত্তর আটলান্টিকের ওপরের অংশে।
কীভাবে তৈরি হয় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ?
সূর্যগ্রহণের জন্য সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবীকে প্রায় একই সরলরেখায় অবস্থান করতে হয়। অমাবস্যার সময় চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে চলে আসে, তখন চাঁদের ছায়া পৃথিবীর ওপর পড়ে। ছায়ার কেন্দ্রীয় ও সবচেয়ে ঘন অংশ—উম্ব্রা—যে সরু পথে পড়ে, সেই অঞ্চল থেকেই পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যায়।
চাঁদ পৃথিবী থেকে এমন একটি দূরত্বে অবস্থান করে যে আকাশে তার আপাত আকার অনেক সময় সূর্যের আপাত আকারের প্রায় সমান হয়ে যায়। তখন চাঁদ সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠ সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলতে পারে। এই অল্প সময়েই সূর্যের বাইরের আবহমণ্ডল বা করোনা স্পষ্টভাবে দেখা যায়—যা সাধারণ সময়ে সূর্যের তীব্র আলোর কারণে চোখে দেখা সম্ভব নয়।
অন্ধকার নামবে, কমে আসবে তাপমাত্রা
পূর্ণগ্রাসের কয়েক মিনিট আগে থেকেই পরিবেশে পরিবর্তন শুরু হতে পারে। সূর্যের আলো কমে আসায় চারপাশের তাপমাত্রা কিছুটা নেমে যেতে পারে, দিনের আলো অস্বাভাবিকভাবে ম্লান হয়ে যেতে পারে এবং প্রাণী ও পাখির আচরণেও সাময়িক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
পূর্ণগ্রাসের মুহূর্তে আকাশে দিনের বেলায় অন্ধকারের আবহ তৈরি হবে। সূর্যের চারপাশে দেখা দিতে পারে উজ্জ্বল সাদা করোনার বলয়। দিগন্তের চারদিকে সূর্যাস্তের মতো কমলা-লাল আভাও দেখা যেতে পারে—বিশেষ করে স্পেনের মতো এলাকায়, যেখানে গ্রহণটি সূর্যাস্তের খুব কাছাকাছি সময়ে ঘটবে।
বাংলাদেশ থেকে দেখা যাবে কি?
এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ১২ আগস্ট ২০২৬-এর পূর্ণ সূর্যগ্রহণ বাংলাদেশ থেকে দৃশ্যমান হবে না। পূর্ণগ্রাসের পাশাপাশি আংশিক গ্রহণও বাংলাদেশে দৃশ্যমান হওয়ার আওতার মধ্যে নেই। ফলে বাংলাদেশে বসে সরাসরি আকাশের দিকে তাকিয়ে এই গ্রহণ দেখার সুযোগ থাকবে না। পূর্ণগ্রাসের প্রধান দৃশ্য দেখতে হলে গ্রহণের নির্দিষ্ট পথের মধ্যে থাকা অঞ্চলেই অবস্থান করতে হবে। নাসার দৃশ্যমানতা মানচিত্রেও বাংলাদেশ পূর্ণ বা আংশিক গ্রহণের দৃশ্যমান অঞ্চলের মধ্যে নেই।
এ কারণে বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৩৪ মিনিটে গ্রহণ শুরু হবে—এমন তথ্য ব্যবহার করার আগে সতর্ক থাকা জরুরি। বৈশ্বিক হিসাবে গ্রহণের বিভিন্ন পর্যায় শুরু হবে এর অনেক আগেই; স্থানভেদে সময়ও পরিবর্তিত হবে। তাই নির্দিষ্ট কোনো দেশের স্থানীয় সময়কে বাংলাদেশের সময় হিসেবে উল্লেখ করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
২০২৪ সালের পর আবার পূর্ণগ্রাস
সর্বশেষ বহুল আলোচিত পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটেছিল ৮ এপ্রিল ২০২৪, যখন মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে পূর্ণগ্রাস দেখা গিয়েছিল। সেই গ্রহণের পর ২০২৬ সালের এই গ্রহণ আবারও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে একই ধরনের বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য দেখার সুযোগ দিচ্ছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে পৃথিবীতে প্রতিবছর মাত্র একটি সূর্যগ্রহণ ঘটে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, একটি বছরে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাধারণত একাধিক সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। কিন্তু পূর্ণ সূর্যগ্রহণের দৃশ্য একটি নির্দিষ্ট সরু পথে সীমাবদ্ধ থাকায় একই জায়গা থেকে এটি দেখা অত্যন্ত বিরল।
আবহাওয়াই হতে পারে সবচেয়ে বড় বাধা
এবারের গ্রহণ দেখতে আগ্রহীদের জন্য সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হতে পারে আবহাওয়া। গ্রহণের পথের কিছু এলাকায় মেঘ বা বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে কয়েক মিনিটের এই বিরল দৃশ্য চোখের সামনে থেকেও আড়াল হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে স্পেনে সূর্যাস্তের কাছাকাছি সময়ে গ্রহণ হওয়ায় পশ্চিম দিগন্ত পরিষ্কার থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই অনেক পর্যটক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমী আগেভাগেই এমন স্থান বেছে নিচ্ছেন যেখানে আকাশ পরিষ্কার থাকার সম্ভাবনা বেশি।
চোখের নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
সূর্যগ্রহণ দেখার সময় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি চোখের জন্য। পূর্ণগ্রাসের আগে ও পরে সূর্যের দিকে খালি চোখে তাকানো বিপজ্জনক এবং স্থায়ী চোখের ক্ষতি করতে পারে। NASA-ও গ্রহণের আংশিক পর্যায়ে উপযুক্ত সৌর পর্যবেক্ষণ চশমা বা নিরাপদ সৌর ফিল্টার ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। শুধুমাত্র পূর্ণগ্রাসের ক্ষণিক পর্যায়ে, যখন সূর্যের উজ্জ্বল চাকতি সম্পূর্ণভাবে চাঁদের আড়ালে থাকে, তখন সরাসরি দেখা নিরাপদ হতে পারে।
মহাজাগতিক ক্যালেন্ডারে আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিন
১২ আগস্টের পূর্ণ সূর্যগ্রহণ শুধু একটি দৃষ্টিনন্দন আকাশীয় ঘটনা নয়; এটি সূর্যের করোনা, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, আয়নমণ্ডল এবং গ্রহণের সময় পরিবেশগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের জন্য বিজ্ঞানীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক মিনিটের এই মহাজাগতিক ঘটনা তাই সাধারণ দর্শকের বিস্ময়ের পাশাপাশি গবেষণারও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করবে।
চাঁদের ছায়া পৃথিবীর ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ছুটে যাবে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট স্থানে পূর্ণ অন্ধকারের মুহূর্ত থাকবে মাত্র কয়েক মিনিট। সেই ক্ষণস্থায়ী অন্ধকারেই দিনের আকাশে ফুটে উঠবে সূর্যের রহস্যময় করোনা—মনে করিয়ে দেবে, পৃথিবী ও মহাকাশের বিশাল ব্যবস্থায় মানুষের অবস্থান কতটা ক্ষুদ্র, অথচ কতটা বিস্ময়কর।
সূত্র: NASA, Iceland Government, Reuters এবং স্পেনের National Geographic Institute (IGN)।
