কাউনিয়ায় তেজপাতা চাষে বদলাচ্ছে কৃষকের অর্থনৈতিক চিত্র
কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় তেজপাতা চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে টেপামধুপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে তেজপাতা এখন কৃষকদের বাড়তি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। গ্রামের সড়কের পাশ, জমির আইল, বাড়ির আঙিনা ও অনাবাদি পতিত জমিতে তেজপাতা চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। তেজপাতার ব্যাপক আবাদে এলাকাটি এখন ‘তেজপাতার গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়নের বাজেমসকুর গ্রামের বিভিন্ন স্থানে সারি সারি তেজপাতার গাছ। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে ফসলি জমির আইল ও পতিত জমিতেও শোভা পাচ্ছে এ মসলাজাতীয় ফসল। অল্প খরচে চাষ, পরিচর্যায় তুলনামূলক কম শ্রম এবং দীর্ঘমেয়াদে আয় করার সুযোগ থাকায় দিন দিন তেজপাতা চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। বাজেমসকুরের পাশাপাশি চৈতারমোড়, রাজীবসহ আশপাশের গ্রামগুলোতেও বিস্তৃত হচ্ছে তেজপাতার আবাদ।
বাজেমসকুর গ্রামের তেজপাতা চাষি আবু সুফিয়ান জানান, তিনি ৬৬ শতক জমিতে প্রায় ৩৫০টি তেজপাতার গাছ লাগিয়েছিলেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত আয় করেছেন অন্তত দুই লাখ টাকা। তিনি বলেন, একবার গাছ লাগালে দীর্ঘদিন ধরে পাতা সংগ্রহ করা যায়। এ ছাড়া বাজারজাতকরণেও তেমন সমস্যা হয় না। বিভিন্ন ক্রেতা ও প্রতিষ্ঠান বাগান থেকেই পাতা কিনে নিয়ে যায়।
একই গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম জানান, আগে তিনি ধান, ভুট্টা ও সবজি চাষ করতেন। এখন তাঁর পুরো জমিতেই তেজপাতার আবাদ করছেন। তাঁর ভাষ্য, অন্যান্য ফসলের তুলনায় তেজপাতা চাষে পরিশ্রম ও খরচ কম, কিন্তু লাভের সম্ভাবনা বেশি। প্রথম বছরে তিনি তিন (০৩)মণ তেজপাতা বিক্রি করেছিলেন। বর্তমানে বছরে প্রায় ১৬ মণ পাতা বিক্রি করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একটি তেজপাতা গাছ থেকে বছরে গড়ে ২৫ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত পাতা সংগ্রহ করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাগান থেকে কাঁচা পাতা কিনে নেন। আবার কেউ কেউ পুরো মৌসুমের জন্য চুক্তিতে বাগান ইজারা নেন। ফলে উৎপাদিত পাতা বিক্রি নিয়ে কৃষকদের দুশ্চিন্তা তুলনামূলক কম।
চৈতারমোড় এলাকার তেজপাতা ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, কাউনিয়া থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩০০ বস্তা তেজপাতা কিনে ঢাকায় পাঠান তিনি। প্রতি কেজি তেজপাতা ১০৮ থেকে ১১২ টাকা দরে বিক্রি হয়। এখানকার তেজপাতার মান ভালো হওয়ায় রপ্তানিকারকেরা সৌদি আরব, দুবাই, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে তা পাঠিয়ে থাকেন বলে জানান তিনি।
কাউনিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সালাহউদ্দিন জানান, কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের সুযোগ থাকায় তেজপাতা চাষ কৃষকদের কাছে লাভজনক ফসল হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে প্রায় ৬৫ হেক্টর জমিতে তেজপাতার আবাদ হচ্ছে। কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, মাটি ও আবহাওয়ার অনুকূল পরিবেশ কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে তেজপাতা চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকদের আয় আরও বাড়বে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতেও এ ফসল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
