বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ৫৫তম শাহাদাত বার্ষিকী আজ

IMG-20260820-WA0008

মো: আল-মাহফুজ শাওন
বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের ৫৫তম শাহাদাত বার্ষিকী আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন দেশের এই বীর সন্তান। মাত্র ২৯ বছর বয়সে দেশের জন্য আত্মত্যাগ করে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

দিবসটি উপলক্ষে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ম্যুরালে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা জানান, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযোগ্য মর্যাদায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জন্ম ও শৈশব

বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার ১০৯, আগা সাদেক রোডের ‘মোবারক লজ’-এ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার রামনগর গ্রামে, যা বর্তমানে ‘মতিউরনগর’ নামে পরিচিত।

নয় ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ষষ্ঠ। তাঁর বাবা মৌলভী আবদুস সামাদ এবং মা সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন।

বিমানবাহিনীতে যোগদান

১৯৬১ সালে মতিউর রহমান পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে রিসালপুর পিএএফ কলেজ থেকে পাইলট অফিসার হিসেবে কমিশন লাভ করেন। কমিশন পাওয়ার পর তিনি করাচির মৌরিপুর, বর্তমানে মাসরুর এয়ারবেজের ২ নম্বর স্কোয়াড্রনে জেনারেল ডিউটি পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৭ সালে তিনি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি লাভ করেন। দক্ষতা, সাহস ও দায়িত্বশীলতার কারণে তিনি সহকর্মীদের কাছে একজন যোগ্য সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার প্রত্যয়

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশের স্বাধীনতার পক্ষে মতিউর রহমানের অবস্থান ছিল দৃঢ়। তিনি ২৩ এপ্রিল ঢাকায় আসেন এবং ৯ মে সপরিবারে করাচিতে ফিরে যান। কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার পরও তাঁর মন পড়ে ছিল স্বাধীনতার সংগ্রামে।

মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একটি জঙ্গিবিমান নিয়ে ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি। সে সময় তাঁকে বিমানের সেফটি অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

২০ আগস্টের সেই সাহসী অভিযান

১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট প্রশিক্ষণার্থী পাইলট রাশেদ মিনহাজের একটি প্রশিক্ষণ উড্ডয়নের দিনকে নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বেছে নেন মতিউর রহমান। তিনি বিমানটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভারতের দিকে রওনা হন।

তবে পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর বাধার মুখে পড়েন তিনি। বিমানটি খুব নিচু দিয়ে উড্ডয়ন করছিল। একপর্যায়ে পাকিস্তানের থাট্টা এলাকায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। ভারতীয় সীমান্ত থেকে ঘটনাস্থলটি ছিল প্রায় ৩৫ মাইল দূরে।

বিমান দুর্ঘটনায় মতিউর রহমান ও প্রশিক্ষণার্থী পাইলট রাশেদ মিনহাজ নিহত হন। মতিউর রহমানের সঙ্গে প্যারাসুট না থাকায় তিনি বিমান থেকে নিরাপদে বের হতে পারেননি।

জাতির শ্রেষ্ঠ বীরদের একজন

স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করার অসামান্য সাহস ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর আত্মত্যাগ আজও বাঙালি জাতিকে দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণা জোগায়।

প্রতি বছর তাঁর শাহাদাত বার্ষিকীতে রায়পুরার মতিউরনগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করা হয়। নতুন প্রজন্মের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরাই এসব আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Reporter: