আওয়ামী লীগ আমলে ২৫০ জন গুমের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

IMG-20260825-WA0014

মো: আল-মাহফুজ শাওন :

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার হয়ে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন—এমন প্রায় ২৫০ জনের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তদন্তে এসব ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অপহরণের শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে নিজ কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান চিফ প্রসিকিউটর।

গুমের মামলার তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে প্রায় ২৫০টি অভিযোগ এসেছে। এরই মধ্যে এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা তদন্তে পাওয়া গেছে। এসব ব্যক্তির এখনো সন্ধান মেলেনি এবং তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অপহৃত হয়েছেন—তদন্তে এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের জবানবন্দি গ্রহণ করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে যেসব স্থান থেকে ভুক্তভোগীদের তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, সেসব স্থানও চিহ্নিত করা হচ্ছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, প্রতিটি পরিবারের অভিযোগ আলাদাভাবে যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সঠিক ও নির্ভুলভাবে তদন্ত সম্পন্ন করতে সময় লাগছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের করা অভিযোগকে চলমান অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং গুমের ঘটনাগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

দল-মত দেখে তদন্ত নয়

গুমের ঘটনায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক বৈষম্য করা হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ভুক্তভোগী ব্যক্তি কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তা তদন্তের ক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়। জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ গুমের শিকার হয়ে থাকলে প্রত্যেকটি ঘটনাকেই একই মানদণ্ডে দেখা হবে।

তিনি বলেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমানসহ কয়েকজনের গুমের ঘটনায় বিচার চলছে। একইভাবে বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলীসহ অন্যান্য নিখোঁজ ব্যক্তিদের ঘটনাও তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনা হবে।

তিনটি মামলার বিচার চলছে

চিফ প্রসিকিউটর জানান, বর্তমানে গুমের তিনটি মামলার বিচার কার্যক্রম চলছে এবং সেগুলো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।

গুমের বাকি অভিযোগগুলোর তদন্তেও গতি বাড়ানো হয়েছে। এর আগে একজন তদন্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করলেও বর্তমানে আরও চারজনকে যুক্ত করে পাঁচ সদস্যের একটি দল গঠন করা হয়েছে। তারা সমন্বিতভাবে গুমের অভিযোগগুলো তদন্ত করছেন।

এ ছাড়া চিফ প্রসিকিউটরসহ অন্যান্য প্রসিকিউটররাও তদন্ত কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় করছেন। শিগগিরই এসব মামলার তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

‘অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই দেখা হবে’

মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, গুমের ঘটনায় তদন্তের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য রাখা হবে না। ভুক্তভোগী ব্যক্তি মুসলিম না হিন্দু, কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী ছিলেন কি না—এসব পরিচয় তদন্তের মানদণ্ড হবে না।

তার ভাষায়, অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং তদন্তে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা করা হবে।

‘মায়ের ডাক’-এর সঙ্গে বৈঠক

এদিকে মঙ্গলবার চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলির নেতৃত্বে কয়েকজন ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য।

বৈঠকে গুমের অভিযোগগুলোর তদন্ত ও বিচার যেন কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত না হয়, সে বিষয়ে অনুরোধ জানান পরিবারের সদস্যরা। একই সঙ্গে চলমান মামলাগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কেও তারা জানতে চান।

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, গুমের প্রতিটি পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। দল-মত নির্বিশেষে প্রত্যেকটি অভিযোগের যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।

Reporter: