কেসিসির এস্টেট অফিসার গাজী সালাউদ্দীনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

IMG-20260816-WA0000

নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা: 

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) এস্টেট অফিসার গাজী সালাউদ্দীনের বিরুদ্ধে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম, শিক্ষাগত সনদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন, সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পুকুর, দোকান, বাজার ও ঘাট ইজারা-বরাদ্দে অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে।

কেসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় সচেতন মহলের একটি অংশ এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কেসিসির সম্পত্তি-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ওই কর্মকর্তার নিয়োগ, পদোন্নতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও আর্থিক কার্যক্রমের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

তবে গাজী সালাউদ্দীনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো কোনো চূড়ান্ত তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে সংশ্লিষ্ট নথি, কেসিসি কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা বোর্ড এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

১৯৯৫ সালে যোগদান, ২০০৬ সালে পদোন্নতি

কেসিসির নথিসূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, গাজী সালাউদ্দীন ১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ‘ট্যাক্স আদায়কারী’ পদে কেসিসিতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি ‘সহ-সুপারিনটেনডেন্ট অব ট্যাক্স’ পদে পদোন্নতি পান।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, ওই পদোন্নতির ক্ষেত্রে তৎকালীন নিয়োগবিধি, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও অন্যান্য শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না। বিষয়টি নিশ্চিত করতে তাঁর মূল নিয়োগপত্র, পদোন্নতির নথি, সার্ভিস রেকর্ড এবং সে সময় কার্যকর সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

শিক্ষাগত সনদের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন

গাজী সালাউদ্দীনের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর এসএসসি ও এইচএসসি সনদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডে সংরক্ষিত মূল রেকর্ডের সঙ্গে কেসিসিতে জমা দেওয়া সনদ যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।

তবে তাঁর শিক্ষাগত সনদ জাল বা ভুয়া—এমন অভিযোগ কোনো কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই অভিযোগটির সত্যতা নির্ধারণে শিক্ষা বোর্ডের মূল রেকর্ড, কেসিসিতে সংরক্ষিত নথি এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের চাকরির রেকর্ড মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ

কেসিসির এস্টেট শাখা নগর কর্পোরেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব-সংশ্লিষ্ট বিভাগ। নগরীর বিভিন্ন মার্কেট, দোকান, পুকুর, ঘাটসহ কর্পোরেশনের সম্পত্তির ইজারা, বরাদ্দ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এ শাখা সরাসরি সম্পৃক্ত।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পত্তির ইজারা ও বরাদ্দে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি কিংবা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কেসিসির রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে গত কয়েক বছরের পুকুর, ঘাট, দোকান ও মার্কেট ইজারার নথি, দরপত্র প্রক্রিয়া, ইজারা মূল্য, আদায়কৃত রাজস্ব এবং বকেয়া অর্থের হিসাব নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন তারা।

জোড়াগেট পশুর হাটসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা

প্রকাশিত সংবাদ ও কেসিসির বিভিন্ন কার্যক্রমের তথ্য অনুযায়ী, গাজী সালাউদ্দীন সম্পত্তিবিষয়ক বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। জোড়াগেট পশুর হাট পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিবসহ বাজার ও ফুটপাত-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমেও তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে।

অভিযোগকারীদের মতে, এসব দায়িত্ব পালনের সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, ইজারা ও বরাদ্দের নথি, রাজস্ব আদায় এবং আয়-ব্যয়ের হিসাবও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

তাদের দাবি, কোনো অনিয়ম বা রাজস্ব ক্ষতি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে তা নিরূপণ করা সম্ভব।

প্রভাবশালী পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ

অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয় ব্যবহার করে গাজী সালাউদ্দীন কেসিসিতে প্রভাব বিস্তার করেছেন। জাতীয় সংসদের সাবেক এক হুইপের আত্মীয় পরিচয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে।

তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ যাচাই ছাড়া এ অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

যেসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি

অভিযোগের প্রকৃত চিত্র এবং কেসিসির কোনো রাজস্ব ক্ষতি হয়ে থাকলে তার পরিমাণ নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। এর মধ্যে রয়েছে—

  • কেসিসির বিভিন্ন পুকুর ও ঘাটের ইজারা প্রক্রিয়া এবং প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের হিসাব;
  • মার্কেট ও দোকান বরাদ্দের নথি, ইজারা মূল্য ও বকেয়া রাজস্ব;
  • সরকারি সম্পত্তি ইজারা ও বরাদ্দে প্রচলিত বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না;
  • গাজী সালাউদ্দীনের মূল নিয়োগ ও পরবর্তী পদোন্নতির নথি;
  • এসএসসি ও এইচএসসি সনদের সত্যতা;
  • জোড়াগেট পশুর হাটসহ তাঁর দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন কার্যক্রমের আয়-ব্যয়ের হিসাব;
  • কোনো অনিয়ম বা রাজস্ব ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গেলে তার পরিমাণ নিরূপণ।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

সচেতন মহলের বক্তব্য, একজন কর্মকর্তার নিয়োগ, পদোন্নতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠলে তা প্রশাসনিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট হওয়া উচিত।

এ কারণে কেসিসির অভ্যন্তরীণ তদন্তের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়গুলো যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। অভিযোগের ধরন ও প্রমাণের ভিত্তি অনুযায়ী প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানের দাবিও উঠেছে।

অভিযোগকারীদের মতে, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ পেলে একদিকে কেসিসির সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে কোনো কর্মকর্তা সম্পর্কে ভিত্তিহীন অভিযোগ থাকলে সেটিও পরিষ্কার হবে।

তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে গাজী সালাউদ্দীনের বক্তব্য এবং কেসিসি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অবস্থান পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হবে।

Reporter: