সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে র‍্যাবের অভিযানে বড় সাফল্য, আত্মসমর্পণ ৪ বাহিনীর ৫২ সদস্যের

IMG-20260901-WA0014

মো: আল-মাহফুজ শাওন

সুন্দরবনকে জলদস্যু ও বনদস্যুমুক্ত করে বনজীবী ও পর্যটকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সুন্দরবনে সক্রিয় চারটি জলদস্যু বাহিনীর ৫২ সদস্য র‍্যাব-৬-এর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন।

সোমবার (৩১ আগস্ট) সুন্দরবনে সক্রিয় বড় জাহাঙ্গীর, আনারুল, আফজাল ওরফে দুলাভাই এবং আফতাব বাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পণ করেন। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) খুলনায় র‍্যাব-৬ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

র‍্যাব-৬ সূত্র জানায়, আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ১৬ জন, আনারুল বাহিনীর ১৩ জন, আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনীর ১৫ জন এবং আফতাব বাহিনীর ৮ জন রয়েছেন। চারটি বাহিনী মিলিয়ে মোট ৫২ জন আত্মসমর্পণ করেছেন।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে ঘিরে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ দীর্ঘদিন ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তবে একসময় সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলদস্যু ও বনদস্যুদের তৎপরতা বনজীবীদের জন্য বড় ধরনের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অভিযোগ রয়েছে, দস্যুরা বন ও নদীপথে চলাচলকারী জেলে ও বনজীবীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়সহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ত। এতে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও জীবিকা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতো।

র‍্যাব-৬-এর ভাষ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীর্ঘদিনের অভিযান এবং সরকারের পুনর্বাসন কার্যক্রমের ফলে এর আগেও সুন্দরবনের একাধিক জলদস্যু ও বনদস্যু বাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এতে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে কয়েকটি দস্যুচক্রের তৎপরতা এবং পূর্বে আত্মসমর্পণ করা কিছু ব্যক্তির পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি বনজীবীদের অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আসে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র‍্যাব গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযান জোরদার করে। র‍্যাব-৬-এর পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও অব্যাহত থাকে।

র‍্যাব-৬-এর কর্মকর্তারা জানান, একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও অভিযান, অন্যদিকে সুন্দরবনের প্রতিকূল পরিবেশে দস্যু জীবনযাপনের ঝুঁকি—সব মিলিয়ে কয়েকটি বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আগ্রহ তৈরি হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় চারটি সক্রিয় জলদস্যু বাহিনীর ৫২ সদস্য আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন।

র‍্যাব-৬-এর কর্মকর্তারা মনে করছেন, একই সময়ে চারটি বাহিনীর অর্ধশতাধিক সদস্যের আত্মসমর্পণের ঘটনা সুন্দরবনের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এতে দস্যুদের সাংগঠনিক সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালসহ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের নিরাপদে বনে প্রবেশ ও জীবিকা নির্বাহের সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি সুন্দরবনের নদী ও বনাঞ্চলে পর্যটকদের নিরাপদ চলাচলের ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

খুলনা র‍্যাব-৬-এর সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদ বলেন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দস্যুদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়সহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বনজীবীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বড় হুমকি ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং পুনর্বাসন উদ্যোগের মাধ্যমে দস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

র‍্যাব-৬ জানিয়েছে, আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হবে।

র‍্যাবের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

এদিকে বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও নির্বিঘ্ন বিচরণ নিশ্চিত করা এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার লক্ষ্যে গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল।

নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা শেষ হওয়ায় মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে নির্ধারিত বিধিবিধান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে সুন্দরবন আবারও পর্যটক ও বনজীবীদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে।

সুন্দরবন উন্মুক্ত হওয়ার ঠিক আগের দিন চারটি জলদস্যু বাহিনীর ৫২ সদস্যের আত্মসমর্পণের ঘটনাকে তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে র‍্যাব। তাদের মতে, দস্যুদের তৎপরতা কমলে বনজীবীদের নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি সুন্দরবনভিত্তিক পর্যটন, মৎস্য আহরণ ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সুন্দরবনকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে অবৈধভাবে কাঠ ও অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণ, বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারসহ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড প্রতিরোধেও তা সহায়ক হবে বলে আশা করছে র‍্যাব।

সুন্দরবনের নিরাপত্তা, বনজীবীদের জীবন-জীবিকার সুরক্ষা এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় র‍্যাবের অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

চারটি বাহিনীর ৫২ সদস্যের একযোগে আত্মসমর্পণের ঘটনায় সুন্দরবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন আত্মসমর্পণকারীদের পুনর্বাসন ও আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করার পাশাপাশি নতুন করে কোনো দস্যুচক্র যাতে সক্রিয় হতে না পারে, সেদিকেও নজরদারি জোরদার রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

Reporter: