খুলনা জেনারেল হাসপাতালে আরএমওর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, নেই জবাবদিহিতা

IMG-20260821-WA0007

মো: আল-মাহফুজ শাওন , খুলনা:
খুলনা জেনারেল হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. এস এম মুরাদ হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন একই হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করার সুযোগে তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এর মাধ্যমে হাসপাতালের কেনাকাটা, রোগী ব্যবস্থাপনা, ডিউটি রোস্টারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

অভিযোগকারীদের দাবি, করোনা মহামারির সময় কোভিড-১৯ পরীক্ষার ফি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ডা. মুরাদ হোসেনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করেছে, যা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। তবে মামলা চলমান থাকার পরও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করায় হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

করোনা পরীক্ষার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, করোনা মহামারির সময় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট খুলনা জেনারেল হাসপাতালে বিদেশগামী যাত্রী ও সাধারণ রোগীদের কোভিড-১৯ নমুনা সংগ্রহ করা হতো। পরে নমুনাগুলো পরীক্ষার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ল্যাবে পাঠানো হতো।

অভিযোগ রয়েছে, ল্যাবে পাঠানো নমুনার প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় কম রোগী দেখিয়ে পরীক্ষার ফি’র একটি অংশ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুলাই পর্যন্ত করোনা পরীক্ষার জন্য মোট ৪ কোটি ২৯ লাখ ৯১ হাজার ১০০ টাকা ফি আদায় করা হয়েছিল। এর মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয় ১ কোটি ৬৮ লাখ ৪৬ হাজার ৭০০ টাকা। ফলে ২ কোটি ৬১ লাখ ৪৪ হাজার ৪০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে।

এ ঘটনায় দুদক সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। অভিযোগে তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ এবং বর্তমান আরএমও ডা. এস এম মুরাদ হোসেনের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মামলার অভিযোগ আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কারও দায় নির্ধারিত হয়নি।

কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ

ডা. মুরাদ হোসেনের বিরুদ্ধে হাসপাতালের বিভিন্ন ধরনের মালামাল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় ভুয়া কিংবা অতিরিক্ত বিল-ভাউচার তৈরির অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে নিম্নমানের সামগ্রী গ্রহণের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া হাসপাতালের সরকারি ওষুধ বাইরে পাচারের চেষ্টা, রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো এবং হাসপাতালের নার্স ও কর্মচারীদের ডিউটি রোস্টার তৈরিতে অর্থ দাবির মতো অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হলেও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনিয়মের অভিযোগ বন্ধ হয়নি।

দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার প্রশ্ন

হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, ডা. এস এম মুরাদ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন। এ দীর্ঘ সময়কে কাজে লাগিয়ে তিনি হাসপাতালের ভেতরে একটি নিজস্ব বলয় বা সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন।

তাদের অভিযোগ, হাসপাতালের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ডে ওই বলয়ের প্রভাব রয়েছে। এমনকি রোগীদের চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রোগীদের বাইরে পাঠানোর অভিযোগ

হাসপাতালে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকলেও রোগীদের কৌশলে বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে ডা. মুরাদ হোসেনের বিরুদ্ধে।

হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোনো রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এলে তাকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাইরে পাঠানো হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরের হাসপাতালের আয়-ব্যয়, কেনাকাটা, রোগী ব্যবস্থাপনা ও পরীক্ষার তথ্য নিরীক্ষা করলে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে তারা দাবি করেন।

সম্পদ অর্জন নিয়েও প্রশ্ন

অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, হাসপাতালের দায়িত্ব পালনকালে ডা. মুরাদ হোসেন বিপুল সম্পদ ও একাধিক যানবাহনের মালিক হয়েছেন। তবে তার নামে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে এবং এসব সম্পদ বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীন তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তার আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, হাসপাতালের ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন তদন্তের দাবি উঠেছে।

ডা. মুরাদ হোসেনের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ডা. এস এম মুরাদ হোসেন বলেন, খাবারের ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে কিছুটা কমবেশি হতে পারে। কোনো রোগী ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেলে পরবর্তীতে ভর্তি হওয়া নতুন রোগীকে বরাদ্দকৃত খাবার দেওয়া হয়।

করোনা পরীক্ষার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে দুদকের মামলা আদালতে চলমান রয়েছে। মামলা চলমান থাকলে কেউ দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না—এমন কোনো নিয়ম তার জানা নেই।

তদন্তের দাবি

হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এতগুলো গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও বিষয়গুলো যথাযথভাবে তদন্ত না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।

তাদের দাবি, করোনা পরীক্ষার অর্থ আত্মসাতের মামলা, হাসপাতালের ক্রয়সংক্রান্ত নথি, বিল-ভাউচার, সরকারি ওষুধের মজুত ও বিতরণ, রোগী রেফারেল, ডিউটি রোস্টার এবং হাসপাতালের আয়-ব্যয়ের তথ্য স্বাধীনভাবে তদন্ত করা হোক। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে দায়মুক্ত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

উল্লেখ্য, ডা. এস এম মুরাদ হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর অনেকগুলোই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে পাওয়া। এসব অভিযোগের বিচারিক বা প্রশাসনিক তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তাকে দোষী হিসেবে গণ্য করা সমীচীন নয়।

Reporter: