নীলফামারীতে গ্রামপুলিশ মিনহাজুলের বিরুদ্ধে তদন্তে সত্যতা: শুনানির পর ব্যবস্থা নাকি দায়সারা পদক্ষেপ

IMG-20260908-WA0002

রাব্বি রহমান নীলফামারী প্রতিনিধি:

সরকারি সেবা কি টাকা ছাড়া মেলে না? জন্মনিবন্ধন করতে, নাম সংশোধন করতে কিংবা সরকারি ভাতা পেতে কি দিতে হয় বাড়তি টাকা? এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে নীলফামারীর গোড়গ্রাম ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ মানুষের মধ্যে। আর এসব প্রশ্নের কেন্দ্রে উঠে এসেছে গ্রামপুলিশ মো. মিনহাজুল ইসলাম মিনহাজের নাম।

বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও মাতৃত্বকালীন ভাতা করে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া, জন্মনিবন্ধন করে দেওয়া, নাম সংশোধন ও জন্মনিবন্ধন ডিজিটাল করার নামে অর্থ আদায়সহ একের পর এক অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। শুধু অভিযোগই নয়, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে যাওয়ার পর হয়েছে সরেজমিন তদন্ত। উপজেলা প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া গেছে। এরপর তাকে দেওয়া হয়েছে কারণ দর্শানোর নোটিশ। এখন ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে তার ব্যক্তিগত শুনানি।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানানোর পরও নতুন করে একাধিক ভুক্তভোগী অর্থ নেওয়া ও সরকারি সেবা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—অভিযোগ ও তদন্তের পর প্রশাসন এবার আসলে কী করবে? কার্যকর ব্যবস্থা, নাকি কেবল নোটিশ-শুনানির আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে দায়সারা পদক্ষেপ?

অভিযোগগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি আমলে নেয় নীলফামারী সদর উপজেলা প্রশাসন। নীলফামারী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছাব্বিরা আমাতুল্লাহ স্বাক্ষরিত ৩ জুন ২০২৬ তারিখের ০৫.৪৭.৭৩৬৪.০০০.০৪.০২৮.২১.৪৫৮ নম্বর স্মারকে অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।সরকারি চিঠিতে বলা হয়, গ্রামপুলিশ মিনহাজুল ইসলাম মিনহাজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশি পোশাকে নিজের ছবি ব্যবহার করেন এবং সাধারণ মানুষকে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, জন্মনিবন্ধন সংশোধনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা দেওয়ার কথা বলে অর্থ গ্রহণ করেন এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় নীলফামারী সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তাকে। তদন্ত কর্মকর্তা সরেজমিনে তদন্ত শেষে ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন। এরপর ৩০ জুলাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা
মোছাব্বিরা আমাতুল্লাহ জানান, তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া গেছে। তদন্ত কর্মকর্তা পেনড্রাইভে ভিডিওচিত্রসহ প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলেও তিনি জানান। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।

তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হলেও অভিযোগের ধারাবাহিকতা থামেনি। বরং নতুন করে একাধিক ব্যক্তি সামনে এসে একই ধরনের অভিযোগ করেন।

১৫ আগস্ট ২০২৬ নগরবন এলাকায় কথা হয় অভিযোগকারীদের সঙ্গে। মোছা. আম্বিয়া, স্বামী হেলাল অভিযোগ করেন, বয়স্ক ভাতা করে দেওয়ার কথা বলে মিনহাজুল তার কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা নিয়েছেন। স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় বিধবা ভাতার জন্য অনলাইনে আবেদন করার সময় মিনহাজুল নিজের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরভাটি, স্বামী মোসলেম উদ্দিন অভিযোগ করেন, বয়স্ক ভাতা করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকেও ৩ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি ভাতা পাননি। রাজিয়া খাতুন, স্বামী আব্বাস আলী জানান, বয়স্ক ভাতার জন্য ৩ হাজার টাকা দিয়েছেন। দেড় থেকে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ভাতা পাননি। বারবার যোগাযোগ করেও সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। মেরিনা, স্বামী রাজু বলেন, তার সন্তানের বয়স দুই মাস থাকা অবস্থায় জন্মনিবন্ধন করে দেওয়ার কথা বলে ৪০০ টাকা নেওয়া হয়। ১৫ দিনের মধ্যে দেওয়ার কথা থাকলেও পরে শুধু “দিব” বলে সময়ক্ষেপণ করা হয়। বর্তমানে ফোন করলেও তিনি ফোন ধরেন না বলে অভিযোগ করেন মেরিনা। নাজমুল ইসলাম, পিতা আলাউদ্দিন অভিযোগ করেন, প্রায় এক বছর আগে ছেলে ও মেয়ের জন্মনিবন্ধনের জন্য ৬০০ টাকা দেন। এখনও জন্মনিবন্ধন হয়নি। তেল ও চিনি কার্ডের কর বাবদ আরও ৯০০ টাকা নেওয়া হয় এবং টাকা না দিলে কার্ড বাতিল হয়ে যাবে—এমন কথা বলা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।রফিক ইসলাম, পিতা সাধীর মিয়া অভিযোগ করেন, মেয়ে রুকাইয়ার বয়স এক মাস থাকা অবস্থায় জন্মনিবন্ধনের জন্য ২০০ টাকা দেন। মেয়ের বয়স এখন সাত মাস হলেও জন্মনিবন্ধন হয়নি।নরগিস অভিযোগ করেন, মেয়ের জন্মনিবন্ধনের নাম সংশোধনের জন্য ৮০০ টাকা দিয়েছেন। এখনও সংশোধন হয়নি। লিলি বেগম, স্বামী নাজু ইসলাম অভিযোগ করেন, স্বামীর জন্মনিবন্ধন ডিজিটাল করার জন্য ৫০০ টাকা দেওয়া হয়েছে। কাজটি এখনও সম্পন্ন হয়নি।রিপন ইসলাম, পিতা আনোয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, প্রায় এক বছর আগে ছেলের জন্মনিবন্ধনের জন্য ২০০ টাকা দেন। এখনও জন্মনিবন্ধন হয়নি। তার ছেলের মূল টিকাদান কার্ডও মিনহাজুল নিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। রহিমা আক্তার, স্বামী মিথুন ইসলাম অভিযোগ করেন, ছেলে ইউসুফ মন্ডল আলীর জন্মনিবন্ধনের জন্য প্রায় এক বছর আগে ৩০০ টাকা দেন। এখনও জন্মনিবন্ধন হয়নি। মোছা. সফিয়া আক্তার, স্বামী জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করেন, ছেলে তানফিজ হাসান আবিদের জন্মনিবন্ধনের জন্য প্রায় এক বছর আগে ৩০০ টাকা দেন। এখনও জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হয়নি।

অভিযোগের তদন্তকে কেন্দ্র করে হুমকির অভিযোগও উঠেছে। মো. রাহাত ইসলাম (২৮), পিতা মৃত বাবুল হোসেন অভিযোগ করেন, ১৩ আগস্ট ২০২৬ দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে ইউনিয়ন পরিষদে তদন্ত সংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার পর বের হওয়ার সময় মিনহাজুল ইসলাম তাকে হত্যার হুমকি, গুম করে দেওয়ার হুমকি ও মারধরের হুমকি দেন। ওই দিন বিকেলেই তিনি নীলফামারী সদর উপজেলা কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন বলে জানান।

অভিযোগের তদন্তের পর ১১ আগস্ট ২০২৬ নীলফামারী সদর উপজেলা কার্যালয় থেকে মিনহাজুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়ে তিনি কারন দর্শানো নোটিশের জবাব দেননি। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বুধবার সকাল ১১টায় নীলফামারী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে তার ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অভিযোগ ও তদন্তের বিষয়ে ব্যক্তিগত শুনানি গ্রহণ করা হবে। তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

দুর্নীতির অভিযোগে কি শুধু আনুষ্ঠানিকতা? এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। একজন গ্রামপুলিশের বিরুদ্ধে সরকারি ভাতা ও বিভিন্ন নাগরিক সেবা পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার একাধিক অভিযোগ। অভিযোগের পর প্রশাসনিক তদন্ত। আবার প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে ভিডিওচিত্র জমা দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। এরপর কারণ দর্শানোর নোটিশ। কিন্তু তদন্তের পরও নতুন ভুক্তভোগী সামনে এসেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মিনহাজুল ইসলাম অনিয়ম ও দুর্নীতির একটি কথিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকেন। প্রশাসন কি দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, নাকি নোটিশ ও শুনানির আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে দায়সারা ব্যবস্থা নিয়ে বিষয়টি চাপা পড়ে যাবে? কারণ, সরকারি সেবা মানুষের অধিকার। সেই সেবা পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ যদি তদন্তেও সত্য বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই নয়—এর পেছনে কেউ থাকলে সেই কথিত সিন্ডিকেটের পরিধিও খুঁজে বের করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এখন তাই সবার নজর ৯ সেপ্টেম্বরের ব্যক্তিগত শুনানি এবং শুনানি শেষে উপজেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দিকে।

অভিযোগের পাহাড়, প্রশাসনিক তদন্তে সত্যতা, একাধিক নতুন ভুক্তভোগীর বক্তব্য এবং হুমকির অভিযোগ—সবকিছুর পর প্রশাসনের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, নাকি শেষ পর্যন্ত এটি পরিণত হয় দায়সারা ব্যবস্থায়—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Reporter: