নাসিমের যেভাবে আন্ডারওয়ার্ল্ডে উত্থান, দুই দশকের আত্মগোপনের পর গুলিতে মৃত্যু
মো: আল-মাহফুজ শাওন, খুলনা:
খুলনার দিঘলিয়ার ফরমাইশখানায় চায়ের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় গুলিতে নিহত হয়েছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ)-এর আঞ্চলিক নেতা নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম। রোববার (৪ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টা থেকে পৌনে ১২টার মধ্যে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, নদীবেষ্টিত দিঘলিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আশি ও নব্বইয়ের দশকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থি রাজনীতির বিস্তার ঘটে। সেই সময় নাসিমও চরমপন্থি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে নিজস্ব ক্যাডার ও যোগাযোগের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে দিঘলিয়া ও আশপাশের এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন তিনি।
নাসিম দিঘলিয়া উপজেলার ফরমাইশখানা এলাকার মৃত আব্দুল গফুরের ছেলে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, তিনি নিষিদ্ধ পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-জনযুদ্ধ) একজন আঞ্চলিক নেতা ছিলেন। চিংড়ি ঘের দখল, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন সালিশ-বিচারে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
চরমপন্থি রাজনীতিতে উত্থান
নব্বইয়ের দশকে খুলনা অঞ্চলে চরমপন্থি তৎপরতা যখন সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন নাসিম জনযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর ধীরে ধীরে ফরমাইশখানা, তেরখাদা ও আশপাশের নদীবেষ্টিত এলাকায় নিজের একটি সশস্ত্র বলয় তৈরি করেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজস্ব লোকজনের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারায় অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনের আঞ্চলিক পর্যায়ে তার প্রভাব বাড়ে।
একাধিক মামলায় আসামি
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নাসিমের বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা ছিল। এসব মামলার মধ্যে হত্যা, অস্ত্র এবং পুলিশের ওপর হামলা বা সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
২০০২ সালের আলোচিত গণেশ হত্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে আদালতে বিচার হয় এবং ওই মামলায় তাকে ৩২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া ফুলতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ইউপি চেয়ারম্যান ছোট কাসেম হত্যা, দিঘলিয়ার ইউপি চেয়ারম্যান জাহিদ হত্যা এবং বিএনপি নেতা রিয়াজ শাহেদকে হত্যাচেষ্টার মামলাতেও তার নাম আসামি হিসেবে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দীর্ঘদিন আত্মগোপনে
২০০২ সালে গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্ত হয়ে নাসিম দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে চলে যান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে প্রায় দুই দশক দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছদ্মবেশে অবস্থান করেন বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের দাবি।
পরে ২০২৩-২৪ সালের দিকে তিনি আবার এলাকায় ফিরে আসেন। এরপর স্থানীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। স্থানীয়দের কেউ কেউ তাকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবেও পরিচয় দিতেন।
পুলিশ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও আলোচিত
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে মুক্ত হন নাসিম। এরপর ২০২৫ সালের ১৮ জুন রাতে দিঘলিয়া থানা পুলিশ তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে থানায় নেওয়ার পথে তার অনুসারীদের হামলার ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ জানায়। ওই সময় তাকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে পৃথক মামলা হয়। এর চার দিন পর, ২২ জুন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নাসিমকে পুনরায় আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি ফরমাইশখানা এলাকায় অবস্থান করছিলেন।
যেভাবে হত্যা করা হয়
রোববার সকালে বাড়ির পাশে তৈয়ব আলীর চায়ের দোকানে বসে ছিলেন নাসিম। স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য মোল্লা হারুনুর রশিদের ভাষ্য, নাসিম বনরুটি ও কলা খাওয়ার পর চা পান করছিলেন।
এ সময় লুঙ্গি পরা দুই যুবক ভ্যান থেকে নেমে চায়ের দোকানে ঢুকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তাদের একজন নাসিমের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি। পরে দুজনই ওই ভ্যানে করে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়।
হারুনুর রশিদ বলেন, গুলি চালানোর পর তিনি একজনকে জাপটে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। তখন অপর যুবক তার দিকে অস্ত্র তাক করলে তিনি তাকে ছেড়ে দেন। তার ধারণা, একজনের বয়স আনুমানিক ২৫ বছর এবং অপরজনের বয়স প্রায় ৩০ বছর।
নাসিমের স্ত্রী মুক্তা জানান, গুলির শব্দ শুনে নিচে এসে তিনি নাসিমকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঘটনাস্থল থেকে গুলি ও খোসা উদ্ধার
দিঘলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাওলাদার সানওয়ার হোসাইন মাসুম জানান, ঘটনাস্থল থেকে তিন রাউন্ড তাজা গুলি ও তিন রাউন্ড গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করেছে এসআরবিসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত চলছে।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে চরমপন্থি তৎপরতা, আত্মগোপন, একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তার-ছিনিয়ে নেওয়ার মতো নানা ঘটনার পর অবশেষে গুলিতে প্রাণ হারালেন নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম। তবে তাকে হত্যার পেছনে কারা এবং কী কারণে এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা তদন্ত শেষে স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
