শিল্পনগরী খুলনায় বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ
ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানায় ব্যাহত উৎপাদন, চিংড়ি শিল্পে বাড়ছে উদ্বেগ
মো. আল-মাহফুজ শাওন
শিল্পনগরী খুলনায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। দিনের বিভিন্ন সময়ে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় প্রচণ্ড গরমে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন নগরবাসী। একই সঙ্গে ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং বিভিন্ন কলকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম। বিশেষ করে খুলনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত চিংড়ি শিল্পে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কয়েক দফায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। কোনো কোনো এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষকে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে পানির সরবরাহ ও দৈনন্দিন কাজেও ব্যাঘাত ঘটছে।
হাসপাতালেও ব্যাহত চিকিৎসাসেবা
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতেও। বিদ্যুৎ না থাকায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জরুরি অপারেশন ও বিভিন্ন চিকিৎসা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ও আইপিএসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে বাড়ছে ক্ষতি
বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও নাজুক। দোকানপাট, শপিংমল, রেস্টুরেন্ট, ওয়ার্কশপ, কম্পিউটার ও অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজের গতি কমে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক ব্যবসায়ীকে জেনারেটর বা আইপিএস ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়, যা সরাসরি ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলছে।
শিল্পকারখানায় ব্যাহত উৎপাদন
লোডশেডিংয়ের কারণে খুলনার শিল্প খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন, সেখানে বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন প্রক্রিয়া থেমে যায়। পরে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও উৎপাদন কার্যক্রম আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগে। এতে উৎপাদন কমার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মঘণ্টাও নষ্ট হচ্ছে।
চিংড়ি শিল্পে বাড়ছে উদ্বেগ
খুলনার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত চিংড়ি শিল্পও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চাপে পড়েছে। চিংড়ি সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হিমায়িতকরণে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে কোল্ড স্টোরেজ, প্রসেসিং ইউনিটসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিংড়ি ব্যবসায়ীদের মতে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হলে একদিকে যেমন অতিরিক্ত খরচ বাড়ে, অন্যদিকে পণ্যের গুণগত মান নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হয়। রপ্তানিমুখী এ শিল্পে সময়মতো প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়ও ব্যাঘাত
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়ও। রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি অনলাইন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষার প্রস্তুতি ও কম্পিউটারভিত্তিক বিভিন্ন কাজেও সমস্যায় পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।
নগরবাসী ও ব্যবসায়ীদের দাবি, শিল্পনগরী খুলনার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের অভিযোগ, একদিকে প্রচণ্ড গরমে জনদুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন ও চিকিৎসাসেবায় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই খুলনার জনজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক রাখতে লোডশেডিং কমিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
