কাউনিয়ায় সোনালী আঁশে সোনালী স্বপ্ন কৃষকের
কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি: রংপুরের কাউনিয়ায় চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষকরা। মাঠজুড়ে পাটের সবুজ সমারোহে কৃষকের মুখে ফুটেছে হাসি। ভালো ফলনের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য পাওয়ার প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছেন তারা। পাটের ভালো দাম পেলে গত কয়েক বছরের লোকসান পুষিয়ে লাভের মুখ দেখার আশা করছেন কৃষকরা।
উপজেলার তিস্তার চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন গ্রামে এবার ব্যাপকভাবে পাটের আবাদ হয়েছে। প্রচণ্ড খরা ও বৃষ্টির স্বল্পতা উপেক্ষা করে অনেক কৃষক সেচ দিয়ে পাট চাষ করেছেন। আলু তোলার পর অনেক জমিতে পাটের আবাদ করা হয়েছে। এছাড়া তিস্তার চরাঞ্চলের যেসব জমিতে ধানের ফলন তুলনামূলক কম হয়, সেসব জমিতেও পাট চাষ করেছেন কৃষকরা। ফলে অন্যান্য এলাকার তুলনায় তিস্তার চরাঞ্চলে পাটের আবাদ হয়েছে বেশি।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাঠের পর মাঠ এখন পাটের সবুজে ছেয়ে গেছে। কোথাও কোথাও পাটগাছ ৭ থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই এসব জমির পাট কাটা শুরু হবে। তবে বর্ষার শুরুতে আশানুরূপ বৃষ্টি না হওয়ায় পাট জাগ দেওয়া বা পচানো নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা।
গদাই গ্রামের পাটচাষি ফুল মিয়া ও পাঞ্জরভাঙ্গা গ্রামের কৃষক আনারুল জানান, চলতি মৌসুমে সারের তেমন সংকট না থাকায় সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে পেরেছেন তারা। প্রচণ্ড খরায় কিছু জমির পাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উপক্রম হলেও পরে বৃষ্টি হওয়ায় গাছগুলো আবার সতেজ হয়ে উঠেছে। এ বছর রোগবালাইয়ের প্রকোপও তুলনামূলক কম ছিল বলে জানান তারা।
কৃষকরা বলেন, গত কয়েক বছর পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তাদের লোকসান গুনতে হয়েছে। একসময় সোনালী আঁশই কৃষকের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে চলতি মৌসুমে ফলন ভালো হওয়ায় এবার উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তারা।
ঢুসমারা চরের পাটচাষি নজরুল ইসলাম বলেন, ফড়িয়া ও দালালদের সিন্ডিকেটের কারণে অনেক সময় কৃষকরা পাটের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। এতে পাট বিক্রির বড় একটি অংশের লাভ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। ফড়িয়ারা যাতে সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
কৃষকরা জানান, পাটের পাশাপাশি পাটখড়িরও ভালো চাহিদা রয়েছে। পাটখড়ি বিক্রি করে বাড়তি আয় করা সম্ভব। তাদের দাবি, ধান ও গমের মতো সরকারিভাবে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি পাট কেনার ব্যবস্থা করা হলে তারা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং পাট চাষে আরও উৎসাহিত হবেন।
এদিকে কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, উপজেলা পাট উন্নয়ন দপ্তর থেকে প্রকৃত পাটচাষিদের প্রশিক্ষণ, বীজ ও সার দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম রয়েছে। কৃষক নন—এমন ব্যক্তিদেরও প্রশিক্ষণ ও কৃষি উপকরণ দেওয়ার অভিযোগ করেন তারা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কাউনিয়ায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭৪০ হেক্টর। সেখানে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এ বছর মোট ৮৬৪ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে।
কাউনিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সালাহ উদ্দিন বলেন, “পাট চাষে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দিয়ে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ বছর আবহাওয়া কিছুটা প্রতিকূল থাকলেও পাটের ফলন ভালো হয়েছে। বর্তমানে পাটের বাজারদরও ভালো রয়েছে। ফলে কৃষকরা ভালো ফলনের পাশাপাশি পাটের ন্যায্যমূল্য পেয়ে লাভবান হবেন বলে আশা করছি।”
