আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যু: বিচার ও স্বচ্ছতার দাবি অব্যাহত

আজ ১৪ আগস্ট, এই দিনে বাংলাদেশের অন্যতম বিতর্কিত ও প্রভাবশালী ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর এই মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশে গভীর শোক ও বিতর্কের জন্ম দেয়, যার প্রভাব এখনও বিদ্যমান।
সাঈদী ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত একজন কয়েদি।
২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। পরবর্তীতে, সুপ্রিম কোর্ট এই সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তর করে। তিনি দীর্ঘ এক দশক কাশিমপুর কারাগারে বন্দী ছিলেন।
২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরদিন তাঁর মৃত্যু হয়।
সাঈদীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার ভক্ত ও সমর্থক হাসপাতালে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হন। জামায়াতে ইসলামী এই ঘটনাকে ‘সুপরিকল্পিত হত্যা’ বলে দাবি করে এবং একটি আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের আহ্বান জানায়। তাদের অভিযোগ ছিল, সাঈদীকে হাসপাতালে নিয়ে আসার সময় থেকেই পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি এবং তাঁর মৃত্যুর পেছনের প্রকৃত কারণ গোপন করা হয়েছে।
দলটির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, “বিশ্ববাসী জানতে চায় এখনো কেন আল্লামা সাঈদীর হত্যাকাণ্ডের মামলা হলো না । অবিলম্বে আল্লামা সাঈদীর খুনিদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।” জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাঃ শফিকুর রহমান ফেসবুক লাইভে এসে দাবি করেন, “আমরা এই মৃত্যুর জন্য সরকারকে দায়ী করি। এটি একটি নিয়মতান্ত্রিক হত্যা।”
তবে, সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে এই অভিযোগগুলো কঠোরভাবে অস্বীকার করা হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকদের মতে, সাঈদীর মৃত্যু ছিল সম্পূর্ণভাবে হৃদরোগজনিত। তাঁরা তাঁর চিকিৎসার বিস্তারিত তথ্য এবং মেডিকেল রিপোর্ট প্রকাশ করেন, যা কোনো ধরনের অসঙ্গতি বা অবহেলা নির্দেশ করে না।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাঈদীর জানাজাকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করেছিল এবং সহিংসতার খবর পাওয়া গিয়েছিল।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়েছে। সাঈদী, যিনি একসময় দেশের জনপ্রিয়তম ইসলামী বক্তাদের একজন ছিলেন, তাঁর মৃত্যু ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিতর্ককে আরো গভীর করেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আগেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াও মিশ্র ছিল। কিছু সংস্থা এবং ব্যক্তি এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
সাঈদীর মৃত্যুর কয় এক বছর পরও, জামায়াতে ইসলামী এবং তাঁর অনুসারীরা তাঁর প্রতি তাঁদের আস্থা পুনর্ব্যক্ত করছেন এবং তাঁর বিচার ও মৃত্যুর ঘটনার জন্য ন্যায়বিচার দাবি করছেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকার এবং তাদের সমর্থকরা সাঈদীকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর কাজের সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন।
এই ঘটনা বাংলাদেশের সমাজের বিভাজনকে আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। সাঈদীর মৃত্যু শুধু একজন ব্যক্তির চলে যাওয়াই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের গভীর অনাস্থার প্রতীক হিসেবেও গণ্য হতে পারে।
