জুয়ারির হাত দেখছে ইরান: তেহরান টাইমস
আঞ্চলিক সমস্যা সমাধানে সার্বিক রূপরেখা প্রণয়নের লক্ষ্য নিয়ে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে তেহরানে এক দিনের সফর শেষ করেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি।
সোমবার বৈঠকের পর নাকভি জানিয়েছেন, মূলত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা, ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ ও ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে উভয় পক্ষের করণীয় কী হবে, সেসব নিয়ে তাদের আলোচনা হয়েছে।
এক্সে তিনি বলেন, “ইরানের প্রেসিডেন্ট খোলামেলাভাবে তার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্বেগের বিষয়গুলো প্রকাশ করেছেন। বিষয়গুলো নিয়ে অত্যন্ত গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাবের মধ্য দিয়ে বৈঠক শেষ হয়েছে।”
তেহরান টাইমস লিখেছে, গত ১৭ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত অবসানের মৌলিক রূপরেখা তৈরি করে। পরবর্তীতে মার্কিন বিমান হামলা ও নৌ-অবরোধের কারণে চুক্তি বিঘ্ন হয়। যদিও গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির চুক্তির মাধ্যমে ৩৯ দিনের যুদ্ধ থামিয়ে পাকিস্তান আগেই নিজেদের কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল।
তেহরান সফরে পাকিস্তানি প্রতিনিধি দল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মহসেন রেজাই, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনিসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে।
পাকিস্তান বলছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ সহজ করা এবং উত্তেজনা কমানোর জন্য গঠনমূলক ভূমিকা ও প্রচেষ্টা নিয়ে ইরানি নেতৃত্ব ইসলামাবাদের ব্যাপক প্রশংসা করেছে। ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের তথ্য ও যোগাযোগবিষয়ক ডেপুটি সৈয়দ মেহদি তাবাতাবায়িও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের এ সফরকে ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই বলপ্রয়োগ ও হুমকির পথ পরিহার করতে হবে। তাদের এ ধরনের পদক্ষেপ উভয়ের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন ও আঞ্চলিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলবে।
“ইরানের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তাদের সুর ও দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন করতে হবে। জোর-জবরদস্তি ও হুমকির পথ কেবল সমাধানের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে।”
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানিদের সহনশীলতা ও দৃঢ়তা রয়েছে, যা জাতীয় ঐক্য ও সংহতির মূল শক্তি। এই সংহতির ওপর ভর করেই এ জাতি যেকোনো চাপ বা হুমকি জয় করবে।
“আর ইসলামাবাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এ অঞ্চলের, সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধি, মর্যাদা ও গৌরবে অবদান রাখবে।”
অপরদিকে ফিল্ড মার্শাল মুনির এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার জন্য প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, যৌথ লক্ষ্য অর্জন আর সার্বিক চুক্তিতে পৌঁছাতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়াগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে। ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যকার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন বর্তমান জটিল পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে মূল্যবান সম্পদ।
মুনিরের সঙ্গে আলাদা বৈঠকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মহসেন রেজাই বলেন, ইরান এখনও অবিশ্বাস করে যুক্তরাষ্ট্রকে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত এমওইউ এর শর্তাবলি বাস্তবায়নে ওয়াশিংটনকে অবশ্যই বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে।
পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের সময় ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার বাকের কালিবফও সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেন।
অসীম মুনিরকে বলেন, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী উভয় পক্ষের প্রতিশ্রুতি সুনির্দিষ্ট। মূলত যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হয়েছে।
“ওয়াশিংটনকে কেন বিশ্বাস করা যায় না, আমাদের সামনে তার আরও একটি কারণ তৈরি হয়েছে।”
এ বক্তব্য নিয়ে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান বলেন, তিনি আঞ্চলিক শান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
অর্থনৈতিক যুদ্ধ তীব্র করেছে যুক্তরাষ্ট্র
তেহরান টাইমস লিখেছে, তেহরানে পরোক্ষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলার মধ্যেই সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সমর্থনকারী দেশগুলোর ওপর ‘সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা’ আরোপের হুমকি দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, বিশ্বজুড়ে ইরানের আর্থিক সংযোগগুলোর বিরুদ্ধে তীব্র অর্থনৈতিক আক্রমণ শুরু করেছেন তারা। এর জন্য নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রকল্প সামনে এনেছেন, যাকে বলা হচ্ছে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’।
ট্রেজারি বিভাগে বেসেন্ট বলেন, “ট্রাম্প বিশ্ব নেতাদের কাছে সরাসরি কল করে ইরানের সঙ্গে লেনদেন ও পারস্পরিক সম্পর্ক বন্ধ করার অনুরোধ করছেন। ইরানের পক্ষে যেকোনো প্রতিষ্ঠান অর্থপাচারের ভূমিকা রাখলে সেটিকে মার্কিন ডলার ব্যবস্থা থেকে বাদ দেওয়া হবে। সময় গণনা এখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে।”
চীনও এই ব্যবস্থার যে বাইরে থাকবে না, সোমবার সেই ইঙ্গিতও দেন বেসেন্ট। তনি বলেন, “আমরা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে চাই, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতার ঊর্ধ্বে কেউ নয়। কেউ যদি ইরানকে লেনদেনে সুবিধা দেয় এবং তার মাধ্যমে ইরানি তেল অর্থে রূপান্তরিত হয়, তবে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।”
এর প্রতিক্রিয়া চীন তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, “চীন এই অবৈধ একতরফা নিষেধাজ্ঞার কঠোর বিরোধী এবং নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সকল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।”
ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের কথা তুলে ধরে মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, “এ দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা সর্বদাই আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে। এতে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ বা বিঘ্ন ঘটানো উচিত নয়।”
অপরদিকে কাতারও ইরানের ওপর এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘একতরফা’ বর্ণনা করেছে। উভয় পক্ষের বিরোধ সমাধানে মধ্যস্থতা চেষ্টার কথা তুলে ধরেন।
তেহরান টাইমস লিখেছে, এই ঘটনাপ্রবাহ ট্রাম্পের ইরান নীতির মূল অসঙ্গতিগুলোকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। একদিকে ট্রাম্প ট্রেজারি সেক্রেটারি বেসেন্টকে পাঠাচ্ছেন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে অর্থনৈতিক যুদ্ধ জোরদার করতে। সে অনুযায়ী তেহরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
অপরদিকে ব্যর্থ যুদ্ধ সৃষ্টির চোরাবালি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে মুক্ত করতে পারে- এমন একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করতে ওয়াশিংটন পাকিস্তান ও এর শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের মধ্যস্থতার ওপরই ভরসা করছে। এর চেয়ে বড় অসঙ্গতি বোধ হয় আর কিছুই হতে পারে না।
